24 Apr 2025

WHO এর মতে স্বাস্থ্য কী?

স্বাস্থ্য মানব জীবনের অন্যতম প্রধান উপাদান। স্বাস্থ্য ছাড়া কোনো ব্যক্তির পূর্ণ জীবন যাপন সম্ভব নয়। কর্মক্ষমতা, শিক্ষা, আনন্দ, সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছুর মূল ভিত্তিই হলো সুস্বাস্থ্য। তাই স্বাস্থ্যকে শুধুমাত্র রোগমুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তা অসম্পূর্ণ হয়। এই উপলব্ধি থেকেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) স্বাস্থ্যকে একটি বিস্তৃত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সংজ্ঞায়িত করেছে।


WHO-এর স্বাস্থ্য সংজ্ঞা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ১৯৪৮ সালে তাদের সংবিধানে স্বাস্থ্য সম্পর্কে যে সংজ্ঞা প্রদান করে, তা হলো:

“Health is a state of complete physical, mental and social well-being and not merely the absence of disease or infirmity.”
বাংলায় অনুবাদ:
“স্বাস্থ্য হলো একটি পূর্ণাঙ্গ শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার অবস্থা, শুধুমাত্র রোগ বা দুর্বলতার অনুপস্থিতি নয়।”

এই সংজ্ঞাটি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্যকে একটি সমন্বিত ও সামগ্রিক ধারণা হিসেবে উপস্থাপন করে।


স্বাস্থ্যের তিনটি প্রধান উপাদান WHO-এর সংজ্ঞায়

WHO-এর মতে, একটি ব্যক্তির স্বাস্থ্যের মূল্যায়ন করতে হলে তাকে শুধুমাত্র রোগমুক্ত অবস্থায় দেখে বিচার করা যাবে না। বরং তিনটি দিক বিবেচনায় নিতে হবে:

১. শারীরিক সুস্থতা (Physical Well-being)

এটি সবচেয়ে প্রচলিত ও সহজে বোঝা যায় এমন স্বাস্থ্য উপাদান। শারীরিক সুস্থতা মানে হলো শরীরের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও কার্যপ্রণালি সঠিকভাবে কাজ করছে, যেমন:

  • হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, হজমপ্রণালি, স্নায়ুতন্ত্র ইত্যাদি সঠিকভাবে কাজ করছে

  • কোনো সংক্রমণ, ব্যথা, আঘাত বা রোগ নেই

  • দেহের শক্তি, স্থায়িত্ব ও নমনীয়তা বজায় রয়েছে

  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যথেষ্ট

এই দিকটি যদি দুর্বল হয়, তাহলে ব্যক্তির জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

২. মানসিক সুস্থতা (Mental Well-being)

শুধু শরীর নয়, মনও সুস্থ থাকা অত্যন্ত জরুরি। WHO-এর সংজ্ঞায় মানসিক স্বাস্থ্য বোঝায়:

  • চিন্তা, আবেগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা

  • মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও হতাশা সামলানোর ক্ষমতা

  • জীবনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব

  • সামাজিক সম্পর্ক গঠনে স্বাচ্ছন্দ্য

বর্তমান বিশ্বে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলি—যেমন বিষণ্নতা, উদ্বেগ, মানসিক চাপ—দিনদিন বেড়েই চলেছে। তাই WHO মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে।

৩. সামাজিক সুস্থতা (Social Well-being)

সামাজিক সুস্থতা বলতে বোঝায়—

  • একজন ব্যক্তি সমাজে আত্মবিশ্বাসের সাথে চলতে পারেন কিনা

  • পরিবারের সাথে, বন্ধুদের সাথে ও সমাজের অন্যান্য মানুষের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন কিনা

  • সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন কিনা

সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা একাকিত্ব দীর্ঘমেয়াদে মানসিক এবং এমনকি শারীরিক স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলে। WHO এই দিকটিকে স্বাস্থ্য সংজ্ঞায় যুক্ত করে স্বাস্থ্যকে একটি সামগ্রিক জীবন ধারণার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।


WHO-এর সংজ্ঞার তাৎপর্য

WHO-এর স্বাস্থ্য সংজ্ঞা আমাদেরকে বলে দেয় যে—

  • স্বাস্থ্য মানে শুধু অসুস্থ না থাকা নয়

  • এটি একটি বহুমাত্রিকসম্পূর্ণতা-নির্ভর অবস্থা

  • ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের সম্মিলিত সুস্থতা স্বাস্থ্য নিশ্চিত করে

  • রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নে এই সংজ্ঞা ব্যবহারযোগ্য

এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, একজন মানুষ তখনই "সুস্থ" হবেন যখন তাঁর শরীর, মন এবং সমাজ—সবক্ষেত্রেই তিনি স্বাভাবিকভাবে চলতে পারেন।


সমালোচনা ও সংশোধনের প্রস্তাবনা

যদিও WHO-এর সংজ্ঞাটি উদার ও আদর্শভিত্তিক, তবুও এই সংজ্ঞার কিছু সমালোচনাও আছে:

  1. “Complete well-being” শব্দটির বাস্তবতা
    অনেকে বলেন, "পূর্ণাঙ্গ সুস্থতা" বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু না কিছু শারীরিক বা মানসিক অসুবিধা আসেই।

  2. সংজ্ঞা খুবই আদর্শবাদী
    এটি একটি ‘উদ্দেশ্য’ হতে পারে, কিন্তু ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের পক্ষে এটি স্থায়ীভাবে অর্জন বা বজায় রাখা কঠিন।

  3. সাংস্কৃতিক পার্থক্য উপেক্ষিত
    বিভিন্ন দেশ বা সমাজে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা হতে পারে। WHO-এর সংজ্ঞাটি এক আঙ্গিক থেকে সব সমাজের জন্য প্রযোজ্য না-ও হতে পারে।

  4. আধ্যাত্মিক দিকের অনুপস্থিতি
    কিছু বিশেষজ্ঞ বলেন, মানুষের আত্মিক বা আধ্যাত্মিক শান্তিও স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা WHO-এর মূল সংজ্ঞায় নেই।

এরপরেও, এই সংজ্ঞাটি স্বাস্থ্যচর্চার দৃষ্টিভঙ্গিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে এবং আজও অধিকাংশ দেশ, সংস্থা ও গবেষকরা এই সংজ্ঞাকে ভিত্তি করে কাজ করেন।


আধুনিক প্রেক্ষাপটে WHO-এর সংজ্ঞার প্রাসঙ্গিকতা

বর্তমান সময়ে, বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে:

  • মহামারি (যেমন COVID-19) মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

  • মানসিক রোগজীবনযাপনজনিত রোগ (যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস) বেড়েই চলেছে।

  • সামাজিক একাকিত্ববিচ্ছিন্নতা মানুষকে সামাজিকভাবে অসুস্থ করে তুলছে।

এই পরিস্থিতিতে WHO-এর সামগ্রিক স্বাস্থ্য সংজ্ঞা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য কেবল চিকিৎসা নয়—এটি প্রতিরোধ, সচেতনতা, জীবনযাপন, পুষ্টি, শিক্ষা ও পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত একটি ব্যাপক ধারণা!

No comments:

Post a Comment

ok